বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে ভোটার হওয়া আমাদের মৌলিক অধিকার। কিন্তু জীবনের প্রয়োজনেই অনেক সময় কর্মস্থল, পড়াশোনা, বিবাহ বা বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় স্থানান্তরিত হতে হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আপনার ভোটার তথ্যও হালনাগাদ করা অত্যন্ত জরুরি। আর এই ভোটার তথ্য হালনাগাদ করার মূল ধাপের অংশ হিসেবে প্রয়োজন হয় ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র। এটি একটি সরকারি নথি, যা প্রমাণ করে আপনি একটি নির্দিষ্ট এলাকা থেকে নতুন এলাকায় ভোটার তথ্য স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেছেন।
এই আর্টিকেলে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো—ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র কী, কেন প্রয়োজন, কীভাবে এটি পাওয়া যায়, অনলাইন ও অফলাইন আবেদন পদ্ধতি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট সকল গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র কী?
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র হলো এমন একটি নথি, যা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিস থেকে প্রদান করা হয়। এটি প্রমাণ করে যে একজন ভোটার তার পূর্বের ঠিকানা থেকে নতুন ঠিকানায় ভোটার তথ্য স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেছেন। এই প্রত্যয়ন পত্র সাধারণত সেই ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ যারা:
- নতুন এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করতে চান,
- পুরনো ভোটার এলাকার তথ্য বাতিল করতে চান,
- অফিস, চাকরি, স্কুল-কলেজ বা বাড়ি পরিবর্তনের কারণে ঠিকানা পরিবর্তন করেছেন।
কেন ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র গুরুত্বপূর্ণ?
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্রের গুরুত্ব অনেক। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
1. নতুন এলাকার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে সুবিধা
স্থানান্তর পত্র ছাড়াই নতুন এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম যোগ করা বেশ কঠিন। এ পত্রটি দেখালে আবেদন দ্রুত এবং ঝামেলাহীনভাবে সম্পন্ন হয়।
2. পূর্বের এলাকার ভোটার নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজন
যাতে আপনি দুটি এলাকায় একই সাথে ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত না থাকেন—এটি নিশ্চিত করে স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র।
3. ন্যাশনাল আইডি বা স্মার্ট কার্ড ঠিকানা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবহার
আপনার এনআইডি কার্ডে ঠিকানা পরিবর্তন করতে গেলে এই পত্রটি প্রয়োজন হয়।
4. বিভিন্ন সরকারি সেবায় ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে
যেখানে নতুন ঠিকানা যাচাই প্রয়োজন, সেখানে এ পত্রটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্টিং ডকুমেন্ট হিসেবে কাজ করে।
কে ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র পাবেন?
যে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক যিনি ইতোমধ্যে ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত এবং নতুন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছেন, তিনি সহজেই ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র সংগ্রহ করতে পারবেন। যেমন—
- চাকরির কারণে অন্য জেলায় বদলি
- বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কারণে অন্য এলাকায় থাকা
- নতুন বাসায় স্থায়ীভাবে বসবাস
- বিবাহজনিত কারণে ঠিকানা পরিবর্তন
- ব্যবসা বা ব্যক্তিগত কারণে স্থানান্তর
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র word file
ভোটার এলাকা পরিবর্তনের প্রত্যয়ন পত্র
এই মর্মে প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে যে, নাম: …………………………………….., পিতাঃ ………………………………………………., মাতাঃ ………………………………………, আমতলা সড়ক, ডাকঘর: ………………, ওয়ার্ড নং – …………….., উপজেলা: …………………………………………, জেলা: ………………………………, জাতীয় পরিচয়পত্র নং –………………………… । তাকে আমি ব্যক্তিগত ভাবে চিনি ও জানি । আমার জানামতে তিনিউপরেউল্লেখিত ঠিকানায় ভোটার আছে এবং বর্তমানে তিনি অন্য ঠিকানায় ভোটার স্থানান্তর করতে ইচ্ছুক । তাহার ভোটার অন্য ঠিকানায় স্থানান্তর করতে করতে আমার কোন আপত্তি নাই ।
আমি তাহার সার্বিক মঙ্গল কামনা করি ।

ভোটার এলাকা স্থানান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র পাওয়ার জন্য সাধারণত নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রয়োজন হয়:
- বিদ্যমান NID কার্ডের কপি
- জন্ম সনদ (যদি এনআইডি না থাকে)
- নতুন ঠিকানার প্রমাণ (বাড়ি ভাড়ার চুক্তিপত্র, হোল্ডিং ট্যাক্স রশিদ, ইউপি চেয়ারম্যান/ওয়ার্ড কাউন্সিলর সনদ)
- পুরনো ঠিকানার তথ্য
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি (কখনো-কখনো প্রয়োজন হয়)
- চাকরি, কলেজ বা অন্যান্য কারণে স্থানান্তর হলে সংশ্লিষ্ট অফিস/শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়া
অফলাইন পদ্ধতি (নির্বাচন অফিসে গিয়ে আবেদন)
যারা সরাসরি নির্বাচন অফিসে গিয়ে আবেদন করতে চান, তারা নিম্নোক্ত ধাপগুলো অনুসরণ করতে পারেন—
১. নিকটস্থ উপজেলা/থানা নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ
প্রথমে নতুন এলাকার সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যেতে হবে।
২. ভোটার স্থানান্তরের ফর্ম সংগ্রহ
নির্বাচন অফিস থেকে ফ্রি ফর্ম পাওয়া যায়। অনলাইন থেকেও ফর্ম ডাউনলোড করা সম্ভব।
৩. প্রয়োজনীয় তথ্য পূরণ
ফর্মে আপনার নাম, পুরনো ঠিকানা, নতুন ঠিকানা, এনআইডি নম্বর ও স্থানান্তরের কারণ উল্লেখ করতে হবে।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা
ফর্মের সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করে জমা দিতে হবে।
৫. যাচাই–বাছাই
নির্বাচন অফিসের কর্মকর্তা আপনার তথ্য যাচাই করবেন। প্রয়োজন হলে বাড়িতে গিয়ে ভেরিফিকেশন করতে পারেন।
৬. ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র প্রদান
যাচাই সম্পন্ন হলে আপনাকে স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র দেওয়া হবে। পরে আপনার নতুন এলাকায় ভোটার তালিকায় নাম যুক্ত হবে।
অনলাইনে ভোটার এলাকা স্থানান্তরের আবেদন (NID সেবা পোর্টাল)
বর্তমানে নির্বাচন কমিশন অনলাইন পরিষেবার মাধ্যমে ভোটার এলাকা পরিবর্তনের সুযোগ দিয়েছে।
১. NID সেবা পোর্টালে লগইন
nidservices.gov.bd এ প্রবেশ করে অ্যাকাউন্টে লগইন করুন বা রেজিস্ট্রেশন করুন।
২. “Update Information” অপশন নির্বাচন
এখানে ঠিকানা পরিবর্তন অপশন পাবেন।
৩. নতুন ঠিকানার তথ্য পূরণ
নতুন জেলা, উপজেলা, ওয়ার্ড, ইউনিয়ন/সিটি কর্পোরেশনের তথ্য দিন।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড
স্ক্যান কপি বা পরিষ্কার ছবি আপলোড করতে হবে।
৫. আবেদন সাবমিট করুন
আবেদন গ্রহণ হলে আপনি একটি ট্র্যাকিং নম্বর পাবেন।
৬. নির্বাচনী অফিসে বায়োমেট্রিক যাচাই
অনলাইন আবেদন করলে সাধারণত অফিসে গিয়ে বায়োমেট্রিক (ফিঙ্গারপ্রিন্ট/ছবি) দিতে হতে পারে।
ফি কত?
ভোটার এলাকা স্থানান্তর করতে ২৪০ টাকা সার্ভার ফি লাগে ।
ভোটার এলাকা স্থানান্তর করতে কতদিন সময় লাগে?
- সাধারণত ৭–১৫ কর্মদিবস
- ভেরিফিকেশনের কারণে কখনো ১ মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
সাধারণ কিছু প্রশ্ন (FAQ)
১. স্থানান্তরের পর পুরনো এলাকায় ভোট দিতে পারব কি?
না। স্থানান্তরের পর আপনি শুধুমাত্র নতুন এলাকার ভোটার তালিকায় ভোট দিতে পারবেন।
২. নতুন এনআইডি কার্ড কি পাব?
হ্যাঁ। ঠিকানা পরিবর্তন হলে নতুন এনআইডি বা স্মার্টকার্ড ইস্যু হবে।
৩. বিদেশে থাকলে কি ভোটার এলাকা স্থানান্তর সম্ভব?
বিদেশে অবস্থান করলে পূর্ণ অফলাইন প্রক্রিয়া করতে পারবেন না। দেশে এসে বায়োমেট্রিক দিতে হবে।
উপসংহার
ভোটার এলাকা স্থানান্তর প্রত্যয়ন পত্র আপনার পরিচয়, অধিকার এবং সরকারি সেবাগুলো সহজে গ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঠিকানা পরিবর্তনের পর দ্রুত এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করলে ভবিষ্যতে এনআইডি যাচাই, ভাতা, চাকরি, দুর্যোগ সহায়তা–সব ক্ষেত্রেই সঠিক তথ্য দিয়ে সুবিধা পাওয়া যায়। তাই নতুন এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করলে অবশ্যই ভোটার এলাকা স্থানান্তর করে প্রয়োজনীয় প্রত্যয়ন পত্র সংগ্রহ করুন।

